Space Probe

আপনি যদি নাসা এবং এর স্পেস মিশনগুলো নিয়ে আগ্রহী হন এবং স্পেসের বিষয়ে অনেক খোঁজ-খবর রাখেন, তাহলে আপনি হয়তো অনেকবার স্পেস প্রোব নামটি শুনেছেন। নাসা তার প্রায় প্রত্যেকটি স্পেস মিশনেই এই স্পেস প্রোব ব্যাবহার করে থাকে। স্পেস প্রোবগুলো ছাড়া আক্ষরিক অর্থেই নাসার কোন স্পেস মিশনই সম্ভব হয়না। কিন্তু আসলে এই স্পেস প্রোব জিনিসটি কি? কেনই বা এটি লঞ্চ করা হয় স্পেসে? কিভাবেই বা কাজ করে এই স্পেস প্রোব? নাসার সাথে পৃথিবীতে এগুলো কমিউনিকেটই বা কিভাবে করে? আজকে স্পেস প্রোব সম্পর্কিত এইসকল বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করবো।

স্পেস প্রোব কি?

সহজ ভাষায় বলতে হলে, স্পেস প্রোব হচ্ছে মানুষবিহীন একটি মহাকাশযান যেটিকে মহাকাশে পাঠানো হয় নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে রিসার্চ করার উদ্দেশ্যে। আমাদের যখন মহাকাশের বা আমাদের সৌরজগতের কোন একটি জিনিস সম্পর্কে কাছ থেকে জানার প্রয়োজন হয়, যেমন চাঁদ বা কোন গ্রহ-উপগ্রহ বা কোন ধুমকেতু ইত্যাদির ক্লোজ পিকচার ক্যাপচার করার দরকার হয়, এগুলো সম্পর্কে কাছ থেকে ইনফরমেশন কালেক্ট করার এবং রিসার্চ করার দরকার হয়, তখন আমরা সেগুলোর কাছে স্পেস প্রোব পাঠিয়ে দেই। আমরা পাঠাই বলতে আপনি বা আমি পাঠাই না, নাসা পাঠায় বা অন্য কোন উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান পাঠায়। স্পেস প্রোবগুলো এদের সাথে স্পেশাল হাই কোয়ালিটি ক্যামেরা এবং অন্যান্য ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে যায় যাতে এগুলোর সাহায্যে সেখানে গিয়ে প্রয়োজনমতো ছবি তুলতে পারে এবং রিসার্চ করতে পারে।

কিছু কিছু স্পেস প্রোব টার্গেটেড গ্রহটি বা উপগ্রহটির আশপাশ থেকে উড়ে জায়ার সময় সেগুলোর ছবি তোলে এবং অন্যান্য ইনফরমেশন কালেক্ট করে। তবে অধিকাংশ স্পেস প্রোব তার টার্গেটের অরবিটে প্রবেশ করে এবং সেটিকে চারদিক থেকে আবর্তন করে এবং সেগুলো সম্পর্কে রিসার্চ করার প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন দেয় আমাদেরকে। যেমন, সেটির ক্লোজ-আপ পিকচার, তাপমাত্রা ইত্যাদি এই ধরনের ইনফরমেশন যেগুলো সাধারনভাবে পৃথিবীতে বসে এমনিতে পাওয়া সম্ভব নয়। এসব স্পেস প্রোবে কোন মানুষ থাকেনা। এই স্পেস প্রোবগুলোর কাজ শুধুমাত্র ডেটা কালেক্ট করা এবং সেই ডেটাগুলোকে পৃথিবীতে মানুষের কাছে ফেরত পাঠানো।

স্পেস প্রোবের ইতিহাস

স্পেসে পাঠানো সর্বপ্রথম প্রোবটির নাম হচ্ছে স্পুটনিক-১ যেটিকে লঞ্চ করা হয়েছিল ১৯৫৭ সালের অক্টোবরের ৪ তারিখে। স্পুটনিক-১ লঞ্চ করেছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। এরপর ১৯৫৮ সালের জানুয়ারির ৩১ তারিখে ইউনাইটেড স্টেটস আরেকটি স্পেস প্রোব মহাকাশে লঞ্চ করে যেটির নাম ছিল এক্সপ্লোরার-১। এই প্রথমদিকে লঞ্চ করা স্পেস প্রোবগুলো কিন্তু পৃথিবীর বাইরের কোন গ্রহ বা উপগ্রহ নিয়ে রিসার্চ করার জন্য পাঠানো হয়নি। বরং এই স্পেস প্রোবগুলোকে পৃথিবীর বাইরে থেকে পৃথিবীকেই পর্যবেক্ষণ করার জন্য লঞ্চ করা হয়েছিলো। এছাড়া এগুলোকেও একরকম পরীক্ষা করার জন্যই লঞ্চ করা হয়েছিলো, দেখার জন্য যে এগুলোকে স্পেসে রাখলে কি হয় বা কোন সমস্যা হয় কিনা এবং এগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে পারে কিনা। এই পরপর স্পেস প্রোব লঞ্চ করার থেকেই আনঅফিশিয়ালি ইউনাইটেড স্টেটস এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্পেসে যাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়।

এরপর যখন স্পেস প্রোব স্পেসে পাড়ি জমানো শুরু করে, তখন থেকেই ইউএস এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশদুটি ঘনঘন স্পেস প্রোব পাঠাতে থাকে পৃথিবীর বাইরে। ম্যারিনার-২ নামের স্পেস প্রোবটি সর্বপ্রথম স্পেসে পৃথিবীর উপগ্রহ এবং অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহের আশপাশে আবর্তন করে। এই ম্যারিনার-২ সর্বপ্রথম অন্য গ্রহ নিয়ে স্টাডি করে। ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে এটি শুক্র গ্রহের কাছাকাছি আসে এবং এই গ্রহ সম্পর্কে আমাদেরকে বিভিন্ন ইনফরমেশন দিতে থাকে। এই প্রোবটি নিশ্চিত করে যে শক্র গ্রহের তাপমাত্রা অনেক বেশি। তবে এই স্পেস প্রোবটি গ্রহের কোন ছবি ক্যাপচার করেনি।

এরপর ম্যারিনার-৪ নামের স্পেস প্রোবটি ছিল প্রথম প্রোব যেটি কোন গ্রহের ছবি তুলেছিলো এবং মানুষের কাছে পাঠিয়েছিলো। ১৯৬৫ সালের জুলাইয়ের ১৪ তারিখে এই প্রোবটি মঙ্গল গ্রহের কাছাকাছি যায় এবং এই গ্রহটির ছবি মানুষের কাছে পাঠায়। এই প্রোবের তোলা ছবিগুলো দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, মঙ্গলের গ্রহের পরিবেশ ঠাণ্ডা এবং অনেকটা চাঁদের মতো।  এরপর ম্যারিনার-৯ নামক স্পেস প্রোবটি সর্বপ্রথম মঙ্গল গ্রহের অরবিটের ভেতরে ঢুকে গ্রহটিকে আবর্তন করে। এটি ছিলো সর্বপ্রথম স্পেস প্রোব যেটি কোন গ্রহের অরবিটে ঢুকে গ্রহটিকে নিয়ে রিসার্চ করতে পেরেছে।

স্পেস প্রোবের উন্নয়ন 

প্রথমদিকে মহাকাশে যেসব প্রোব পাঠানো হয় সেগুলো শুধুমাত্র আমাদের সৌরজগতের মধ্যেই আমাদের প্রতিবেশি প্ল্যানেটগুলোকে প্রদক্ষিন করেছে এবং সেগুলো নিয়েই স্টাডি করেছে। তবে প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথেই এই স্পেস প্রোবগুলোও দিনদিন যথেষ্ট উন্নত এবং আরও বেশি ফাংশনাল হয়ে গিয়েছে এবং এখনও হয়ে চলছে। অধিকাংশ স্পেস প্রোবই শুধুমাত্র পৃথিবী এবং আশেপাশের অন্যান্য গ্রহগুলো নিয়ে ইনফরমেশন কালেক্ট করে। তবে কিছু কিছু স্পেস প্রোব টেলিস্কোপ এবং এই ধরনের অন্যান্য যন্ত্রপাতির সাথে লঞ্চ করা হয় যাতে সেগুলো আমাদের থেকে অনেক অনেক দুরের গালাক্সি এবং অনেক দুরের নক্ষত্রমণ্ডল নিয়ে রিসার্চ করতে পারে। মাঝে মাঝে টিভিতে আমরা অনেক দূরের কোন গ্যালাক্সিতে নতুন কোন গ্রহ বা উপগ্রহ নিয়ে অনেক নিউজ দেখতে পাই। সেগুলো মুলত এই ধরনের স্পেস প্রোবগুলোরই ক্রেডিট। এই ধরনের উন্নত প্রযুক্তির স্পেস প্রোবগুলোকে আমরা অনেক নামে চিনে থাকি। যেমন- স্পেসক্রাফট, অরবিটার, ল্যান্ডার, রোভার ইত্যাদি।

তবে এখনও পর্যন্ত লঞ্চ করা সবথেকে বিখ্যাত এবং সবথেকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্পেস প্রোবটির নাম হচ্ছে ভয়েজার-১। এটি মানুষের তৈরি একমাত্র মহাকাশযান যেটি স্পেসে এতটা দূর অতিক্রম করতে পেরেছে, যেমনটা অন্য কোন স্পেস প্রোব করতে পারেনি। এই স্পেস প্রোবটি লঞ্চ করা হয়েছিলো ১৯৭৭ সালে এবং ইতোমধ্যে এটি বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহকেও অতিক্রম করে ফেলেছে। বর্তমানে এটি আমাদের সৌরজগতের শেষ প্রান্তের দিকে আগ্রসর হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি ১, ২০১০ এর হিসাব অনুযায়ী এই স্পেস প্রোবটি আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬.৮ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্বে আছে।

স্পেস প্রোবগুলো কিভাবে কমিউনিকেট করে?

প্রথমত, স্পেস প্রোবগুলো আসলে কি টেকনোলজি ব্যাবহার করে পৃথিবীর সাথে কমিউনিকেট করে এবং কি কি পদ্ধতিতে ইনফরমেশন পাঠায়, তার সব খুঁটিনাটি আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব না। কারণ, নাসা তাদের সব টেকনোলজির সব খুঁটিনাটি পাবলিশ করেনা। তবে মেইন কনসেপ্টটি, যেটি সবাই জানে, তা হচ্ছে, কমিউনিকেশনের জন্য রেডিওওয়েভ টেকনোলোজি ব্যবহার করা হয়। তবে সবক্ষেত্রে নয়। যেসব স্পেস প্রোব স্পেসে পৃথিবীর বাইরের অরবিটালে গিয়ে কোনকিছু রিসার্চ করে, সেগুলোর কিছু কিছু ইনফরমেশন ফিজিক্যালি পৃথিবীতে ফেরত আনা হয়। যেমন, অ্যাপোলো মিশনগুলোতে প্রায় ৩৮২ কেজি লুনার স্যাম্পল পৃথিবীতে ফেরত আনা হয়েছিলো রিসার্চের উদ্দেশ্যে। ফিজিক্যালি এই ধরনের যেসব ইনফরমেশন ফেরত আনা হয়, এগুলো স্পেস প্রোগ্রামগুলোর সবথেকে মূল্যবান ইনফরমেশনগুলোর মধ্যে অন্যতম।

তবে রিসেন্টলি নাসা এইধরনের কমিউনিকেশনের জন্য রেডিও ওয়েভের পরিবর্তে লেজার ব্যবহার করার কথা ভেবেছে। এসব হাই ফ্রিকুয়েন্সির লেজার ব্যবহার করলে স্পেস প্রোবগুলোর সাথে কমিউনিকেট করা আরও দ্রুত এবং আরও সহজ হয়ে যাবে। বর্তমানে যেসব স্পেস প্রোব পৃথিবীর থেকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে থাকে, সেগুলোর সাথে কমিউনিকেট করা অনেক সময়সাপেক্ষ। যেমন, মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে রিসার্চ করার জন্য যেসব রোভার পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর সাথে রেডিওওয়েভের মাধ্যমে কমিউনিকেট করতে হলে কতিপয় মিনিট বা ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায় কমান্ড সেন্ড করা এবং স্পেসক্রাফট থেকে রেসপন্স রিসিভ করার মধ্যে।

  • Share on :


TAG CLOUD

POST COMMENT

For post a new comment, You need to login first.

COMMENTS (1)

rggsdfgsd