গ্লোবাল ওয়ার্মিং : জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের করণীয় !

ক্লাস ৫ এর পাঠ্যবই থেকে শুরু করে বড় বড় ডিগ্রি এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং কে নিয়ে করা হচ্ছে। আর এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং কি কেন এবং কিভাবে হয় আর এটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনে কিভাবে প্রভাব ফেলে থাকে তা নিয়ে আপনি কিছু জানেন কি? না জানলে আজকের পোষ্টটি শুধুমাত্র আপনারই জন্য। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে আপনি একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে দেখবেন যে এগুলো (ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ, সুনামি, বন্যা ইত্যাদি) আমাদের সাধারণ মানুষের অনেক ক্ষতি করে থাকে।

অন্যদিকে বিশ্বে অহরহ ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলা, নিউক্লিয়াম হামলা এগুলো কিন্তু সবাই একটি দেশকে বা একটি স্থানকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। কখনো কি শুনেছেন পুরো বিশ্ব ব্যাপী ভূমিকম্প হচ্ছে? বা পুরো বিশ্ব ব্যাপী সুনামি হচ্ছে বা পুরো বিশ্ব ব্যাপী সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে? কিন্তু আজ যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি তা হলো গ্লোবাল ওয়ার্মিং।

প্রতিনিয়ত বিশ্বের তাপমাত্র বেড়ে যাচ্ছে, আর এটাকেই ইংরেজিতে গ্লোবাল ওয়ামিং বলা হয়। আর এই গ্লোবাল ওয়ামিং কিন্তু কোনো দেশ কেন্দ্রিক বা কোনো স্থান কেন্দ্রিক হিসেবে হচ্ছে না; এটি পুরো বিশ্বব্যাপী ঘটছে। আর এভাবে বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে খুব শীঘ্রই অদূর ভবিষ্যৎতে বিশ্বের জলবায়ু এমন ভাবে পরিবর্তন হয়ে যাবে যার কারণে বিশ্বের বুক থেকে অনেক ধরণের প্রাণী  একদমই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে (যেমন আমাদের বাংলাদেশ) মানুষের বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়বে।


 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং কি? (সহজ ভাষায়)

ধরুণ আপনি আমেরিকার Alaska অঞ্চলে বসবাস করেন। এই অঞ্চলটি পুরোটাই বরফ দিয়ে ঢাকা থাকে এবং এখানে শীতের পরিমাণ অনেক বেশি। আর এই শীত থেকে বাঁচতে আপনি একটি কাঠ-কুঠোয় আগুন ধরালেন। আগুনের তাপ আপনাকে পরিবেশের ঠান্ডা ভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখবে এবং আপনাকে আরাম দিবে। কিন্তু একসময় আপনার মনে হবে যে এই তাপমাত্রা আপনার জন্য এবং আপনার পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়।

আপনি আগুণকে বাড়ানোর জন্য আরো কাঠ-কুঠো দিয়ে দিলেন। আগুণের মাত্রা বেড়ে গেলো। কিন্তু ধরুণ আপনি এত পরিমাণের আগুণ দিয়ে দিলেন বা আগুণকে বড় করে দিলেন যে এখন আপনার বাসায় আগুণের তাপমাত্রা অনেক বেশি বেড়ে গেছে এবং এটা সহ্য করার বাইরে চলে গিয়েছে। তখন আপনার মনে হবে যে আগুণ ধরানোটাই ভূল হয়েছে। আর তখন এই বড় মাপের আগুনকে নিয়ন্ত্রণে আনা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বিষয়টি অনেকটাই এই ঘটনার মতো।

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং

 

বিশ্বের মানুষগুলো এমন এমন কিছু কাজ করে থাকে যার কারণে প্রতি বছরে বিশ্বের উষ্ণতা একটু একটু করে বেড়েই যাচ্ছে। কিন্তু এই উষ্ণতা আমাদের চোখে পড়ার মতো না, কারণ প্রতি বছর যে পরিমাণের উষ্ণতা বাড়ছে সেটা অনেক কমই কিন্তু এভাবে বাড়তে থাকলে এক সময় গিয়ে উষ্ণতা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে যে তখন আর উষ্ণতা কমানোর কোনো রাস্তা থাকবে না। ১৯০০ শতকে গ্লোবাল ওয়ামিংয়ের জন্য বিশ্বে তাপমাত্রা বেড়েছিলো ০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে। কিন্তু ২১ শতকের শেষে এসে দেখা গেলো যে এই গ্লোবাল ওয়ার্মি য়ের জন্য বিশ্বের তাপমাত্রা ২ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমানে ইতিমধ্যেই ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে প্র্রায় ৭৫% এবং ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াম হারে বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে ৫০%। তবে বিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে এই হারে চলতে থাকলে এই শতকের শেষের দিকে বিশ্বের তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে।

 

 

এখন আপনার মনে হতে পারে যে এই ৩ বা ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়লে এ আর এমন কি? কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ্য করলে দেখবেন যে Ice Age বা বরফের যুগে এই ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়তে সময় লেগেছিলো প্রায় ৫০০০ বছর। আর বর্তমানে আমরা মাত্র ১০০ বছরের মধ্যেই পৃথিবীর তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়িয়ে নিচ্ছি। আর একবার বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে এটাকে কমিয়ে আনা অনেক কঠিন একটি কাজ এবং সম্পূর্ণ রূপে কমিয়ে আনা একদমই অসম্ভব একটি কাজ।

মানে হচ্ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং একটি আতঙ্কের নাম। ধরূণ ধরে নিলাম ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। এখন বর্তমানে বাংলাদেশের জৈষ্ঠ্য কালের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা গিয়ে দাড়ায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এখন ৩০০০ বা ৩০১০ সালে গিয়ে বাংলাদেশের এই তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়াবে (৩৮+৩) ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রাতেই বাংলাদেশে গরমের জন্য বসবাস করা যায় না আবার ৪১ ডিগি হয়ে গেলে যে কি হবে আপনারাই কল্পনা করেন।



 

কি কারণে গ্লোবাল ওয়ার্মিং হচ্ছে?

গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণ হিসেবে দোষারোপ করা হয় গ্রীণ হাউজ ইফেক্ট নামের একটি ঘটনা কে। একটি গ্রীণহাউজ (বা গ্লাসহাউজ) য়ে কোনো কিছু উৎপাদন করা বেশ সহজ কাজ কারণ গ্রীণহাউজ তার তাপমাত্রাকে হাউজের ভিতরে বন্দি করে রাখে এবং হাউজের চারিপাশের আবহাওয়ার থেকে বেশ গরম হয়ে থাকে। যেমন ধরুণ চুলায় পাতিলে ভাত রান্নার করার থেকে একটি প্রেসার কুকারে তুলনামূলক ভাবে বেশ দ্রুতই ভাত সিদ্ধ হয়ে যায়। এই গ্রীণ হাউজ ইফেক্টকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো নিচে আমি দিয়ে দিচ্ছি:

 

(ক) প্রাকৃতিক গ্রীণহাউজ ইফেক্ট

গ্রীণহাউজ ইফেক্ট সম্পর্কে আশা করবো বেসিক ধারণা পেয়েছেন। বিশ্বের বায়ুমন্ডলটা এই গ্রীণহাউজের মতোই চলতে থাকে। বিশ্বের বায়ুমন্ডলটাকে একটি বড়সড় গ্রীণহাউজ হিসেবে ধরে নিন, তাহলে আপনার বুঝতে সুবিধা হবে। এই বিশ্বের বায়ুমন্ডলটা তাপমাত্রাকে বিভিন্ন উপায়ে ধরে রাখে। বিশ্বের বায়ুমন্ডলে প্রাকৃতিক গ্যাসের হার অনেক বেশি, এদের মধ্যে রয়েছে মিথেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইড। এই প্রাকৃতিক গ্যাসগুলো পৃথিবীর চারিপাশে গ্লাসের মতো করে ঘিরে থাকে। আর যখন সূর্যের আলো এই গ্যাসগুলোর ভিতর দিয়ে পৃথিবীতে প্রবেশ করে তখনই পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়তে থাকে।

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং

 

উষ্ণতা বাড়তে থাকায় পৃথিবী তার কিছু হিট এনার্জিকে মহাকাশের দিকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু অনেক সময় মহাকাশের দিকে ছেড়ে দেওয়া এই উষ্ণতা গুলো বায়ুমন্ডল ভেদ করতে পারে না এবং তারকারণে উষ্ণতাগুলো আবারো পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই কারণেই পৃথিবী তার গড় মাত্রায় (৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ক্রমান্নয়ে ঘুরতে থাকে। এটাকেই বলা হয় প্রাকৃতিক গ্রীণহাউজ ইফেক্ট। আর এই প্রাকৃতিক গ্রীণহাউজ ইফেক্ট একটি ভালো জিনিস। কারণ এটি না থাকলে পৃথিবীর তাপমাত্রা অনেক ঠান্ডা থাকতো এবং এখানে মানুষের বসবাস করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াতো।

 

(খ) কৃত্রিম গ্রীণহাউজ ইফেক্ট

প্রাকৃতিক গ্রীণহাউজ ইফেক্টে মানুষের প্রত্যক্ষ হাত না থাকলেও কৃত্রিম গ্রীণহাউজ ইফেক্ট মানুষের জন্যই হচ্ছে। ১৮ এবং ১৯ শতকের শিল্প বিপ্লবের পরেই কৃত্রিম গ্রীণহাউজের ইফেক্ট ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তখন প্রথমে কয়লা পুড়িয়ে স্ট্রিম ইঞ্জিণের ব্যবহার ব্যাপক ভাব শুরু হয়। আর তখন থেকেই মানুষ বিভিন্ন এনার্জিকে বেশি করে ব্যবহার করা শুরু করে দেয়। যেমন ১৯০০ শতকের মাঝামাঝিতে গাড়ির ইঞ্জিণ আবিস্কার হওয়ার পর সেটাকে চলানোর জন্য পেট্রোলের ব্যবহার শুরু হয়। আর গাড়ি থেকে বের হওয়া ক্যামিক্যাল হিট পৃথিবীর আবহাওয়াকে ধীরে ধীরে গরম করা শুরু করতে থাকে।

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং

 

এছাড়াও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রগুলোতে এই কয়েল, গ্যাস এবং তেল জ্বালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এই জ্বালিয়ে দেওয়া উপাদানগুলোকে বলা হয় Fossil Fuels বা জীবাশ্ম জ্বালানী। এই Fossil Fuels পরিবেশে অনেক বড় পরিমাণের কাবর্ন ডাই অক্সাইডের মেঘ তৈরি করে থাকে যাকে বলা হয় carbon dioxide emissions । আর যার কারণে পৃথিবীর কার্বন ডাই অক্সাইডের গ্যাসের  ঘনত্ব বছর প্রতি বাড়তে থাকে আর তাই পৃথিবী থেকে মহাকাশে দিকে নির্গত তাপমাত্রা পৃথিবীতে আরো বেশি পরিমাণে বদ্ধ হয়ে যায়; যার ফলাফল বছর প্রতি বিশ্বের তাপমাত্রা আরো দ্রুত হারে বাড়তে থাকে। একে বলা হয় কৃত্রিম গ্রীণহাউজ ইফেক্ট।


 

গ্লোবাল ওয়ামিং কি দিন দিন খারাপ হচ্ছে?

হ্যাঁ অবশ্যই। আমরা প্রতিনিয়ত যে পরিমাণের fossil fuels জ্বালাচ্ছি তার কারণে গত ৪ লক্ষ ২০ হাজার বছরের মধ্যে বর্তমানেই সবথেকে বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে জমা রয়েছে। শিল্প বিপ্লবের আগে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ছিলো প্রতি মিলিয়নে 280 parts । আর বর্তমানে এর পরিমাণ গিয়ে দাড়িয়েছে 380 parts প্রতি মিলিয়নে। এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে মাত্র ১৫০ বছরেই পৃথিবীর কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ এতো বেশি মাত্রায় বেড়ে গেলো যে তা এখন বর্তমানে পরিবেশবাদীদের মাথা খারাপ করে দিচ্ছে।

  • Share on :


POST COMMENT

For post a new comment, You need to login first.

COMMENTS (0)

No comments yet, Be the first :)